Friday, April 15, 2016

‘মেসিলোনা’-র ত্রিমুকুটের স্বপ্ন চুরমার !


কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ফিফা-ভাইরাস, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অভিশাপ, ক্লান্তি। কারণ তবুও এর কোনওটাই নয়! বার্সেলোনার ত্রিমুকুট জেতার স্বপ্ন চুরমার হল ভিসেন্তে কালদেরনে, নিজেদের জন্যই। এত খারাপ খেললে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার অধিকার থাকে না, সহজ সত্য!

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে বাকি দুই দল হিসাবে গেল আতলেতিকো মাদ্রিদ ও বায়ার্ন মিউনিখ। ২-০ জিতল আতলেতিকো, গ্রিজমানের জোড়া গোলে। বায়ার্নকে (২-২) টেনে নিয়ে গেল ভিদাল ও মুলারের গোল। ঘরের মাঠে ১-০ জয়ই ব্যবধান হয়ে থাকল। পেপ গারদিওলার কোচ হিসাবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সপ্তম মরসুম। সাতবারই তাঁর দল সেমিফাইনালে খেলেছে। অনন্য রেকর্ড বললেও কম!


য্খন রেয়াল মাদ্রিদের দরকার ছিল, হ্যাটট্রিক করেছিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। যখন বার্সেলোনা তাকিয়েছিল লিওনেল মেসির দিকে, গোলে একটা শটও রাখতে পারলেন না বিশ্বের সেরা ফুটবলার! এমনকি, শেষ মিনিটে যখন রেফারি নিকোলা রিজোলির ভুল সিদ্ধান্তে পেনাল্টি না-পেয়ে ফ্রি কিক পেয়েছিল বার্সেলোনা, মেসি সেই শটটাও মারলেই বাইরে। চাপের সময় ওখান থেকে গোল করতে পারলেও অতিরিক্ত সময়ে গড়াত খেলা। পারেননি। ঠিক যেমন পারেননি অনুরূপ পরিস্থিতিতে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালেও ফ্রি কিক থেকে গোলে রাখতে। ৪৫২ মিনিট তিনি গোলহীন, ‘মেসিলোনাও ছন্দহীন!

মেসির নায়ক হওয়ার মঞ্চে নায়ক হয়ে গেলেন আর এক আর্জেন্তিনীয় দিয়েগো সিমিওনে। বার্সেলোনাকে দুবার হারালেন তিনি ১৭-ম্যাচে। দুবারই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউটে। বার্সেলোনা গত আট বছরে এই দুবারই সেমিফাইনালের আগে থামল। আতলেতিকো মাদ্রিদের রক্ষণাত্মক রেকর্ড ঈর্ষণীয়। মরসুমে ৪৫ ম্যাচের মধ্যে ২৮ ম্যাচে কোনও গোল খায়নি! লুইস এনরিকে আগে সাতবারই হারিয়েছিলেন। একবার জিতলেন সিমিওনে। মোক্ষম সময়ে!

গ্রিজমানের দুটো গোল, দুই অর্ধে। প্রথমবার সাউলের সেন্টারে মাথা ছুঁইয়ে, দ্বিতীয়টা পেনাল্টি থেকে। সেই পেনাল্টি যা আতলেতিকো পেয়েছিল বক্সের মধ্যে বার্সেলোনা-অধিনায়ক ইনিয়েস্তা বাঁহাত দিয়ে বল আটকানোয়। নিশ্চিত লাল কার্ড। রেফারি রিজোলি কেন হলুদ দেখিয়েছিলেন, বলা কঠিন। তাঁর রেফারিং নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন এমনিতেও, সব সময়। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে তিনিই ম্যানুয়েল নয়ারকে লাল কার্ড দেখাননি, গোনজালো ইগাইনের ঘাড়ে চেপে গালে ঘুষি মারার পরও! এখানে ইনিয়েস্তাকে তখন লাল কার্ড দেখালে খেলার শেষ মিনিটে যে-পেনাল্টি না-পাওয়ার জন্য বার্সেলোনা আপসোস করছে, প্রশ্নটাই উঠত না! ইনিয়েস্তার শটই তো বক্সের মধ্যে হাতে লাগিয়েছিলেন তখন আতলেতি-অধিনায়ক গাবি!

সিমিওনে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন ফুটবলারদের। এই দলটা অন্যরকম। সবাই বিশ্বাস করে, পারবে। পেরেই দেখাল। লড়াই ওদের রক্তে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গেল। হারজিত থাকে, থাকবেও। কিন্তু, সমাজ যখন আদর্শহীন হয়ে পড়ছে ক্রমশ, আমাদের দল দেখিয়ে যাচ্ছে, আদর্শের জন্য সব কিছু করা সম্ভব। কখনও বিশ্বাস হারায়নি।এনরিকে-র কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, পেনাল্টির সিদ্ধান্ত ঠিকঠাক দিলেই কি বার্সেলোনা এগিয়ে যেতে পারত? গত মরসুমে পাঁচ-ট্রফি পাওয়া কোচ পরিষ্কার বলেছেন, ‘দেখতে পাইনি ঠিক করে। পেনাল্টি ছিল? হতে পারে! কিন্তু, আতলেতিকো যোগ্য দল হিসাবে জিতেছে, ওদের অভিনন্দন জানানোই কর্তব্য, সেটাই করছি। ভাল খেলতে পারিনি, পারছি না কয়েকটা ম্যাচে। ৯৯ দশমিক নয় নয় শতাংশও নয়, একশো শতাংশ দোষই আমার। হাতে এখনও দুটো ট্রফির জন্য লড়াই রয়েছে। ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।

সেমিফাইনালের চার দলকে বিশ্লেষণ করেছেন গারদিওলা। ম্যাঞ্চেস্টার নতুন ইতিহাস লিখতে চাইছে, রেয়াল মাদ্রিদ বরাবরের মতোই তৈরি, আর আতলেতিকোর মানসিকতার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। তাই, কাদের বিরুদ্ধে খেলতে হবে নিয়ে মাথা ঘামানো অর্থহীন। লটারিতে যাদের বিরুদ্ধে নাম উঠবে, প্রস্তুতি নিতে হবে সেই দিকে তাকিয়েই।প্রসঙ্গত, সেমিফাইনালের লটারি আজ শুক্রবার, ভারতীয় সময় বিকেল তিনটেয়, সুইৎজারল্যান্ডের নিয়ঁ-তে। আর হ্যাঁ, ম্যাঞ্চেস্টার সিটির নাম যদি ওঠে বায়ার্নের বিরুদ্ধে, ‘গারদিওলা-বর্তমানদলের বিরুদ্ধে খেলা পড়বে গারদিওলা-ভবিষ্যৎদলের!

ফুটবল নিষ্ঠুর খেলা, গারদিওলা বারবার বলেন। বার্সেলোনা তার চরম নিদর্শন। ফিফা বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে যাওয়ার আগে লিগে ১২ পয়েন্টে এগিয়ে, কোপা দেল রে ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে, যে কোনও দলকে স্রেফ উড়িয়ে দিচ্ছে এম-এস-এন ত্রয়ী। বাছাইপর্ব থেকে ফেরার পরের চার ম্যাচে জয় মাত্র একটি, বিদায় নিয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে, লা লিগায় ব্যবধান কমে এসেছে তিনে। এখন তো প্রশ্ন, লা লিগাতেও কি খেতাব ধরে রাখতে পারবে এই ছন্নছাড়া মেসিলোনা’?


রোনালদোর দুরন্ত হ্যাটট্রিক...


কাশীনাথ ভট্টাচার্য

রেমোন্তাদা, রোনালদো - বের্নাবেউ নাচল-গাইল এই দুই শব্দে! জব্দ করল উল্ফসবুর্গকে, পৌঁছল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে টানা ছ'বার, রোনালদোর হ্যাটট্রিকে। মঙ্গল-রাতে অন্য ম্যাচে এতিহাদে ইতিহাস লিখল ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, প্রথমবার ইউরোপে সেমিফাইনালে উঠে, কেভিন ডে ব্রুইনের গোলে জিতে।

রেমোন্তাদা স্পেনীয় শব্দ। অর্থ, ফিরে আসা। এমন পরিস্থিতি থেকে, যেখান থেকে ফেরা বেশ কঠিন। যেমন ছিল রেয়ালের। ০-২ পিছিয়ে, তিনগোলের ব্যবধানে জিততে হবে। পরিস্থিতি কঠিন হলে যাঁরা সহজে কাজের কাজ করে ফেলতে পারেন, জিনিয়াস তো তাঁরাই। নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ফেললেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। এক মরসুমে তিন-তিনটি হ্যাটট্রিক, তা-ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে! এবার দশ ম্যাচে ১৬ গোল! চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মোট ৯৩ গোল। আর নিজের ২০১৩-১৪ মরসুমের সর্বোচ্চ ১৭ গোলের রেকর্ড ভাঙার জন্য আরও দু'ম্যাচ হাতে!


'রেকর্ড ভাঙা নিয়ে ভাবতে ভালই লাগে। কিন্তু তার চেয়েও বড়, দলের যা প্রয়োজন, করতে পারা। পিছিয়ে থেকেও আমাদের খেলায় শুরু থেকেই ছিল জেতার তীব্র তাগিদ। শুরুতেই দুটো গোল পেয়ে যাওয়ায় প্রাথমিক চাপটা কমে গিয়েছিল।দু-পর্ব মিলিয়ে যোগ্যতর দল হিসাবে আমরাই সেমিফাইনালে', বলেছেন বের্নাবেউ-এর নায়ক। দিলেন নিজের ক্লাবকে 'উনদেসিমা' বা এগার বার ইউরোপে সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা জেতার নতুন লক্ষ্যে এগিয়ে চলার প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস!

প্রথম গোল ১৬ মিনিটে। ডানদিক থেকে উঠে এসে কার্ভাহালের নিচু সেন্টার। উলফসবুর্গের ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডার দাঁড়িয়ে দেখলেন, যেতে দিলেন বলটা। দূর থেকে ফলোকরে এসে রোনালদো বিনা বাধায় পা ছুঁইয়ে গেলেন। তার ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই ২-২। এবার কর্নারে সবার মাথা ছাড়িয়ে উঠে হেডে। হ্যাটট্রিকের গোল ফ্রি-কিক থেকে। সামনে মানবপ্রাচীরে ফাটল! সেখান দিয়ে গলে গেল, এল রেয়ালের সেমিফাইনালে ওঠার ছাড়পত্র। তবে, যে-ফাউলের কারণে ওই গোল, ফাউল ছিল কি? মোদরিচের পা থেকে নিখুঁত ট্যাকলে বল কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মোদরিচ পড়ে যান, রেফারি ফাউলের নির্দেশ দেন। কিন্তু, এমন অসম্ভবকে সম্ভব করার রাতে এইসব ছোটখাটো ভুল নিয়ে কে আর মাথা ঘামাবে!

ম্যাঞ্চেস্টার সিটির সুবিধা ছিল, অ্যাওয়ে ম্যাচ থেকে ২-২ নিয়ে ফিরেছিলেন আগেরোরা। ঘরের মাঠে আরও আগেই এগিয়ে যেতে পারত সিটি। কিন্তু আগেরো পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি। ঠিক যেমনভাবে ইব্রাহিমোভিচ মিস করেছিলেন নিজেদের মাঠে, তার থেকেও খারাপ শট নিয়েছিলেন আগেরো। বল বাইরে। তাতে ক্ষতি ছিল না, অন্তত যতক্ষণ পিএসজি গোল না-পাচ্ছে। ইব্রা, দিমারিয়া, কাভানিদের দরকার ছিল জয়, এক গোলে হলেও। ইব্রার প্রচুর খ্যাতি আছে বিভিন্ন উপায়ে গোল করার ক্ষেত্রে। সেই গোলগুলো বিশেষ, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কাজের দিন কিছুই কাজে এল না। দিমারিয়া ম্যাঞ্চেস্টারেই এক বছর ছিলেন, তবে ইউনাইটেডে। ফিরলেন আবার একই শহরে খেলতে, ফিরে গেলেন সেই শূন্যহাতেই! লরাঁ ব্লাঁ-র দলকে কখনই মনে হয়নি, জেতার সেই তাগিদ নিয়ে খেলছেন যা নিয়ে যেতে পারত তাদের, ইউরোপের প্রথম চারে। তাই পেয়েগ্রিনি, এই মরসুমের পর যিনি সিটির দায়িত্ব ছাড়বেন, যাওয়ার আগে সিটিকে দিয়ে গেলেন নতুন ইতিহাস। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেরা চার দলের মধ্যে নাম তুলে।

তবে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টিকে-থাকা একমাত্র ইংরেজ ক্লাবের এমন কৃতিত্বের দিনেও প্রচারের সব আলো নিয়ে গেলেন সেই রোনালদোই। স্পেনে তাঁর সঙ্গে লিওনেল মেসির দ্বৈরথ গত সাত ভচর ধরে আলোচনার শীর্ষে। মঙ্গল-রাতে প্রতিদ্বন্দ্বীর এই পারফরম্যান্সই কি জাগিয়ে তুলবে ৩৬২-মিনিট গোল না-পাওয়া মেসিকে, বুধ-রাতে আতলেতিকোর বিরুদ্ধে?


Post a Comment