Showing posts with label Sao Paulo. Show all posts
Showing posts with label Sao Paulo. Show all posts

Sunday, October 11, 2015

ঈশ্বরের সই কি নেওয়া যায়, সম্ভব?

কাশীনাথ ভট্টাচার্য



ভোররাতেই বিপত্তি!
ব্রাজিলে প্রথম রাত। সাও পাওলোর হোটেলের ঘরে একা। বাইশ ঘন্টার বিমানযাত্রার পর ঘন্টা দুই গাড়িতে। কোনও রকমে ঘরে ঢুকে স্নান সেরে কিছু খেয়েই ঘুম। মনেই ছিল না মোবাইল-ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়ার কথা। পরদিন সকাল-সকাল উঠেই যেতে হবে আরেনা কোরিন্থিয়ান্সে, বিশ্বকাপ ‘কভার’ করার জন্য ‘অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড’ তুলতে। মাথায় ওই চিন্তা নিয়েই বিছানায়। আর, ঘুম যখন ভাঙল? মোবাইল-ঘড়ি দেখাল সাড়ে এগারটা!
জেট-ল্যাগ কাটানো ঘুম বলে কথা! কিন্তু, সময় দেখে চোখ কপাল ছাড়িয়ে টাকে! কখন মাঠে যাব, কখন কার্ড তুলব? স্নান-টান সেরে নিলাম চটপট। পাটভাঙা ধুতি হয়, জামা কি বলা যায় ইস্তিরিভাঙা? কে জানে, ভাবার সময়ও নেই। চটপট দেখে নিলাম ফিফার পাঠানো ইমেল-এর প্রিন্ট আর পাসপোর্ট ব্যাগে আছে কিনা। ‘দুগ্গা দুগ্গা’ বলে বেরিয়ে পড়া, ঘর লক করে।
সাততলা থেকে রিসেপশনে নেমে কফি মেশিন দেখে থমকে যাওয়া। ঘুম থেকে উঠে যে কিছুই খাইনি, মনে পড়ল যেন। পাশে ব্রেকফাস্ট-এর ঘর। কিন্তু, বড়-বড় করে লেখার সারকথা, ‘সাড়ে দশটার পর খাবার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’। পর্তুগিজ ভাষায় পণ্ডিত নই। যা লেখা ছিল ইংরেজির ওই ‘টেন’ আর ‘থার্টি’ পড়েই বুঝে নেওয়া। আমার সময় তখন বারটা দশ। ‘খামোখা ভেবে লাভ নেই, চটপট কফিটা খেয়ে ট্যাক্সিতে ওঠ রে, ব্রাজিলে প্রথম সকালটাই মাখিয়ে ফেললি’ মনে মনে নিজেকে অশ্রাব্য কিছু শব্দ বলে কফির জন্য দাঁড়ালাম। ‘চিনি-ছাড়া’ বোঝাতে প্রাণান্ত। নাটক শিখিনি, হাত নেড়ে বোঝানোও সমস্যা। কোনও রকমে বুঝল মিষ্টি মেয়ে। নজর সরাইনি। ঠিক যা ভেবেছিলাম! শেষে চিনির দুটো পাউচ এগোতেই ‘না না’ বলে ফেরত। তৃপ্তির চুমুক ব্রাজিলের বহুকালের শোনা বিখ্যাত কফিতে। দৃষ্টি অবশেষে সামনে এবং আবারও চোখে অবিশ্বাস! বাইরেটা এত কালো কেন?
বুদ্ধিদীপ্ত চোখে চশমা, ছিপছিপে লম্বা, ইংরেজি-জানা এরিক গত রাত থেকে তখনও কাজে। কী ব্যাপার বলুন তো, এত অন্ধকার কেন বাইরে, জিগ্যেস করেই ফেললাম, কফিতে আরও দুটো চুমুক মেরে। ঠোঁট চওড়া হল, ‘রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশ বাজে, অন্ধকার তো থাকবেই। আপনাদের ইন্ডিয়ায় কি’ কথা শেষ করতে দিই না এরিককে। মোবাইল বলছে সোয়া বারোটা। মাথা খুলল তখন। সাও পাওলো বিমানবন্দরে নেমে ভেবেছিলাম, ঘড়ির সময়টা বদলে নেব, ভারত থেকে ব্রাজিলে। ভুলে গিয়েছি। সাড়ে আট ঘন্টা এগিয়ে চলছি আমি, ভারতীয় সময়ানুসারে!
অগত্যা কফি শেষ করে, কনকনে ঠাণ্ডায় হোটেলের মূল ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট শেষ করে আবার পাততাড়ি গুটিয়ে সাততলার ঘরে। ইস্তিরিভাঙা জামা-প্যান্ট ছেড়ে কম্বলের তলায়। ঘড়িকে ব্রাজিলের সময়ে পরিবর্তিত করে, সকাল আটটায় অ্যালার্ম দিয়ে, আবারও ঘুমের দেশে।
গৌরচন্দ্রিকা এত বড় হলে রাগ করতেই পারেন, অধিকার আছে চটে যাওয়ার। কিন্তু, নিরুপায়। দিনের শুরুতেই ‘এমন’ বিপত্তি বললে সেই ‘এমন’টা যে ঠিক ‘কেমন’ বুঝিয়ে বলার দায় থাকে। তাই, (পেলের) ধান ভানতে শিবের (থুড়ি, সময় পরিবর্তনে বিপত্তির) গীত!
দিনের শেষে অবশ্য এই শর্মাই গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে মুণ্ডপাত করছিল ইংরেজি প্রবাদের। কোন হালায় কইসে রে, (বঙ্গানুবাদে) দিনের শুরুটা কেমন হল দেখে সারা দিনটা কেমন যাবে আন্দাজ করা যায়? গলায় ফিফা বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড, পকেটে পেলের প্রেস কনফারেন্স, সঙ্গে আবার ক্যামেরায় পেলের ছবিও! ওভাবে দিন শুরু করে সেই দিনের শেষেই এগুলো সম্ভব?
প্রবাদকেও প্রমাদ বানিয়ে দেওয়া সেই সৃষ্টিছাড়া দিনে আসলে দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই সব পায়ে-বলে ঠিকঠাক। ভাষা বিভ্রাট সম্পর্কে সম্যক ধারণা আগের রাতেই হয়ে যাওয়ায় ইংরেজি ছেড়ে বাংলায় ফিরে এসেছিলাম সেই সকাল থেকেই। তাতেই বোধহয় সিদ্ধিলাভ! একা একাই ট্যাক্সি চড়ে আরেনা কোরিন্থিয়ান্স-এ। কার্ড তোলা, পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা, গল্প। কলকাতার কয়েকজন আরও আগে গিয়েছিলেন। যা হয় বিদেশে তারপর। গপ্পোগাছা, কী কী ‘কপি’ পাঠানো হল, চর্চা। আমি তখনও খাতা খুলিনি। তাই কিছু বলার নেই, শুধুই শোনা। লুকোনরও কিছুই নেই যে!
একই অবস্থা ছিল ধীমানেরও। ধীমান সরকার, হিন্দুস্তান টাইমস-এর মস্ত ফুটবল-লিখিয়ে। ব্রাজিল ওর তৃতীয় বিশ্বকাপ। কলকাতা থেকে একসঙ্গেই গিয়েছিলাম, একই ফ্লাইটে। বিয়াল্লিশ দিন পর ফিরবও একসঙ্গেই। কার্ড তুলে গপ্পো করছি, ধীমানই জানতে চাইল, সন্ধেবেলা কী করব। মনে হল, গল্প একটা আছে বোধহয়। ধীমানের বন্ধু আবার ফিফায় ভলেন্টিয়ার। ঘোড়ার মুখের খবর, জারদিম পাউলিস্তা যেতে হবে। পাঁচতারা হোটেল স্কাই। ফুটবল পত্রিকার উদ্বোধন। কাফু থাকছেন। সাও পাওলো তো কাফুরই শহর। আর ছিল সেই ব্রাজিল যাত্রার যা অন্যতম কারণ, পেলে নাকি আসতে পারেন!
সাংবাদিক হিসেবে লুকোচুরির কিছু নিয়ম আছে। চুপি চুপি নয়, বেরিয়ে গেলাম সবাইকে টা-টা করেই। সন্ধে সাতটায় শুরু। সাও পাওলোর মেট্রো চেপে খানিক দূর। তারপর ট্যাক্সি এবং গন্তব্যে পৌঁছন নির্ধারিত সময়ের মিনিট পনের আগে। গলায় ঝোলানো ফিফার কার্ড। বেশ মেজাজেই ঢুকে পড়লাম অনাহূত। সোজা লিফটে এবং রুফটপ। এলাহি কাণ্ড। গান বাজছে, স্টেজ তৈরি। পানপাত্রে চলকে যায় সন্ধে। ব্রাজিলের সুগন্ধিত-সুন্দরীদের প্রথম দেখা, অত সামনে থেকে। সাংবাদিক, ক্যামেরাওম্যান-রাও এমন ডাকসাইটে সুন্দরী!
হঠাৎ গুঞ্জন। কাফু ঢুকলেন। তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল, পরপর। ঘরে দুটো বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি। ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, যদি সুযোগ পাই ভিড়টা কাটলে। পাওয়া গেল আধঘন্টা পর। সবাই গিয়ে ‘সেলফি’ নিচ্ছে, আমরা ছবিই তুললাম। কথা বলতে যেতেই, ‘নো ইংলেস’, ‘নো ইংলেস’। অতঃপর, দুপাশে দু্ই বঙ্গসন্তান, মাঝে কাফু, থাকলাম খানিকক্ষণ। অনেকক্ষণ বললেই ঠিক। নির্ধারিত সময় পার। কাউকে জিগ্যেস করে যে জানব, তিনি আসবেন কখন, উপায় নেই। প্রায় সবাই ‘নো ইংলেস’ দলে। ঘন্টা দেড়েক কেটে গেল। কলকাতার মতো কোনও কোনও খুব পরিচিত সাংবাদিক তো বার তিনেক নিয়ে ফেললেন কাফুর বাইট! একবর্ণও বুঝিনি তো কী, আমরা মাঠ ছেড়ে, মানে কাফুকে ছেড়ে, পালাইনি!
আবার একটা হইচই এবং কাফু হঠাৎ একা। কলকাতা থাকাকালীনই বহু বিজ্ঞ বাঙালির মুখে শুনেছিলাম, পেলেকে নাকি ব্রাজিলে কেউ দেখতেই পারে না! চোখের সামনে দেখলাম, কাফু স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়ি্য়ে দেখলেন, ৭৪-বছর বয়সী কেউ কীভাবে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত করছেন, তখনও। আমরাও দৌড়লাম, বাধ্য। নীল স্যুট, সাদা জামা, হলদে-কালো টাই, কুচকুচে কালো চুলের চিরসবুজ সম্রাট ততক্ষণে আসরে!
ক্যামেরার ভিড় ঠেলে গুটি গুটি পায়ে একেবারে সামনে। নিজের হাতেও ক্যামেরা। পরপর ছবি তুলছি, পাগলের মতোই। দেড়হাত দূরে ঈশ্বর! ফুটবল শব্দটাই তো জানা তাঁর সৌজন্যে। খেলতে দেখিনি, প্রশ্নই ছিল না। কলকাতায় সাতাত্তরে যখন এসেছিলেন, বয়স সাড়ে সাত। শুধু বাঁশি শুনেছি-র মতো, কিংবা বিজ্ঞাপন, সির্ফ নাম হি কাফি হ্যায়। ওই নামেই ফুটবল, ওই নামেই ব্রাজিল, ওই নামেই আকর্ষণ। কোথায় ইউটিউব তখন! বয়সে বেড়ে বইতে পড়া, ছবি দেখা। অমোঘ টান!

যা লিখেছিলাম সেই দিন, মিড-ডে কাগজে
পর্তুগিজ পত্রিকার ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হল। তারপর, নানা প্রশ্ন। কাফুর মতো ‘নো ইংলেস’ বলেননি, গোটা তিনেক প্রশ্ন ইরেজিতেই, উত্তরও এল ইংরেজিতে। বাকিগুলো একবর্ণও বুঝিনি। শেষ হতেই ল্যাপটপের দিকে নজর ঘুরে-ঘুরে। ইংরেজিতে লিখছেন নাকি কেউ, তীক্ষ্ণ নজরদারি। ‘এদিকে আয়, পেয়েছি’ ধীমানের স্বর তখন লতা মঙ্গেশকারের চেয়েও মধুর!

মিড-ডে, সেই স্টোরি-র লিংক - http://www.mid-day.com/articles/brazil-has-no-obligation-to-win-the-world-cup-pele/15366192

তিনি চলে যাওয়ার পরই অন্যদিকে তাকানোর ফুরসত। যতক্ষণ ছিলেন, কাফুর দিকেও কেউ ফিরে তাকাননি। ব্রাজিল যে পাঁচবার বিশ্বজয়ী, ওই দুজনের ঘরে সেই পাঁচটা ট্রফির প্রতিরূপ আছে! এমনকি, টানা তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার কৃতিত্ব পেলেরও নেই। তবু, কাফু যেন তৃতীয় শ্রেণীর হিন্দি ছবির পার্শ্বনায়ক। পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, সঙ্কুচিত। গলা উঠছে না। ভাবখানা, ‘উনি থাকতে আমাকে কেন’!
তখন কি আর জানতাম যে, বিশ্বকাপে পরের ৪১ দিনে আর কখনও দেখা পাব না তাঁর? আসবেনই না আর বিশ্বকাপের ধারেকাছে? সাহস করে প্রথম রাতেই সই চেয়ে নিতাম তা হলে, নির্লজ্জ। হাতের এত কাছে, এই কলকাতাতেই তো পাব না তাঁকে, কখনও।

কিন্তু, পরে মনে পড়েছিল, ঈশ্বরের কি সই হয়, নেওয়া যায়?