Tuesday, June 24, 2025

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / রোজারিও–র চে, রোজারিও–র মেসি!


** আজ আটত্রিশ পূর্ণ করলেন। জন্মদিনে ফিরে-দেখা ১৫ বছর আগের লেখায়

বল ছিনতাইয়ে ছলই বল! সেখানে আকাশি–সাদা ডোরা, পিঠে দশ নম্বর, নিজের লক্ষ্যে অবিচল
I am not Christ or a philanthropist, old lady, I am all the contrary of a Christ... I fight for the things I believe in, with all the weapons at my disposal and try to leave the other man dead so that I don't get nailed to a cross or any other place.
— Che Guevara
রোজারিওয় জন্ম এরনেস্তো চে গেভারার, ১৪ জুন ১৯২৮।
রোজারিওতেই জন্ম লিওনেল মেসির, ২৪ জুন ১৯৮৭।
একই শহর, একই মাস, মাঝে ৫৯ বছর শুধু!
ছোট্ট চে ভুগত অ্যাকিউট অ্যাজমায়, সারা জীবনই ভুগেছিলেন। খেলার প্রতি ভালবাসা কমেনি তাতে। বুয়েনোস আইরেসে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাগবি দলের সদস্য, খেলতেন আগ্রাসী ‘ফ্লাই–হাফ’ হিসেবে। ভালবাসতেন ফুটবল, সাঁতার আর দাবা। মোটরসাইকেলে লাতিন আমেরিকা দেখতে বেরিয়ে পড়েন যিনি দু–দুবার, অ্যাজমা তাঁকে আটকে রাখতে পারে কখনও? আর, দক্ষিণ আমেরিকার শোষিত–নিপীড়িতদের দিশা দেওয়ার ভার যিনি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেবেন পরে, হয়ে উঠবেন পরিত্রাতা কোটি কোটি মানুষের, তুলনায় খেলার ছোট জগতে কী করেই বা নিজেকে সীমাবদ্ধ থাকতে পারতেন আর্জেন্তিনার সেই ক্ষণজন্মা?
ছোট্ট লিও ভুগত বেড়ে–ওঠার হর্মোনের স্বল্পতায়। কিন্তু, সে তো বাবা–মা, চিকিৎসকদের চিন্তা। তাতে কি আর ফুটবলের প্রতি ভালবাসা কমে? রিভারপ্লেট তাকে না নিল তো বয়েই গেল! লা মাসিয়া আকাদেমি তো বসেছিল হাত বাড়িয়েই, বার্সেলোনায়। চিকিৎসার দায়ভার নিয়ে নিলে যদি ভবিষ্যতের পরিত্রাতাকে পাওয়া যায় ফুটবল মাঠে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তিই বা আর কী?
ব্যস্, সাদৃশ্য–অনুসন্ধান পর্ব এখানেই শেষ। চে–র প্রভাব বা চে–র ব্যপ্তির সঙ্গে লিওনেলের প্রভাব কোনওভাবেই তুলনীয় হতে পারে না, জীবনের মাঠে চে কত গোলে হারাবেন লিওনেলকে, সেই সংখ্যা নিয়ে জল্পনা চলতে পারে, হার নিয়ে একেবারেই নয়। লম্বা চুল, খোঁচা দাড়ি, মাথার টুপিতে তারা চিহ্ন — আলবের্তো কোর্দার তোলা চে–র সেই ছবি আজও বিশ্বে সবচেয়ে বিখ্যাত। ‘বিপ্লব সেই গাছ–পাকা আপেল নয় যা নিজের ভারে মাটিতে এসে পড়ে, বিপ্লবকে পেরে আনতে হয়’, এমন সহজ করে বোঝাতেই বা পেরেছিলেন কে কবে কোথায়?
মেসির ধান ভানতে চে–র গীত গাওয়ার মানে একেবারেই এই নয় যে, চে–র মতোই প্রভাবশালী হিসেবে মেসিকে চিহ্নিত করার ‘বৈপ্লবিক’ প্রয়াস! একই শহরে জন্মানো দুই প্রতিভা সম্পর্কে কিছু মিল, আর হ্যাঁ, অনেক ছোট স্তরে হলেও যা কোনও মতেই অস্বীকার করা যাচ্ছে না আর, সমকালীন ফুটবলে লিওনেলের প্রভাব। মেসি তো সেখানে লড়ছেনও চে–র অস্ত্রেই, চে–র শেখানো রাস্তায়!
জন লি অ্যান্ডারসনের বই ‘চে গেভারা — এ রিভোলিউশনারি লাইফ’–এ মা–কে চিঠিতে লিখেছিলেন চে সেই কথাগুলো যা এই লেখার একেবারে শুরুতে উদ্ধৃত। ‘... যা বিশ্বাস করি তার জন্যই লড়ি। আমার হাতে যা অস্ত্র আছে তাই নিয়েই। চেষ্টা করি বিপক্ষের মানুষটাকে মেরে ফেলতে, যাতে পরে তার হাতেই কোনও ক্রস বা অন্য কোথাও আমার মৃত্যু না হয়’। মানবপ্রেমী যিশু বা তাঁর ক্রুসিফিকেশন সম্পর্কে ‘ওল্ড লেডি’ মা–কে চে–র ব্যাখ্যা।



বৃত্তটাকে ছোট করে ফুটবল মাঠে নিয়ে আসুন, মেসিকে দেখতে পাচ্ছেন না? তাঁর হাতে (এখানে পায়ে) যা যা অস্ত্র — বল নিয়ন্ত্রণ, বল–দক্ষতা, ড্রিবল, যে কোনও অবস্থান থেকে যেখানে খুশি বল পাঠানোর ক্ষমতা, গতি, শরীরের ভাঁজ, ছন্দ, সৌন্দর্য — দিয়েই তো চেষ্টা করে চলেছেন তাঁর বিপক্ষকে ‘মেরে’ ফেলতে, মানে হারাতে আরও একটা ম্যাচে। তাঁর বিশ্বাস থেকে নড়েননি। ফুটবল খেলতে হলে বল–পায়েই খেলতে হবে। বল–ছাড়া ফুটবল খেলা হয় না, তা নয়। কিন্তু, তাতে তাঁর আস্থা নেই। তিনি বল চাইবেন পায়ে, তিনিই তৈরি করবেন মুহূর্ত, সেই মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি হয়ে আশ্রয় নেবে আমাদের মনোমন্দিরে, আমরা পাতা ওল্টাব অবসরে, দেখব সেই ছবিগুলোই আবার, বার বার।
তাঁর বিপক্ষে কত কত কোট–টাই পরিহিত বেঞ্চে–বসা লোক! তাঁরাও রোজ ভেবে চলেছেন, কী করে আটকে দেওয়া যায় তাঁকে, মেরে ফেলা যায় ফুটবল নামক ওই গোলকের আকর্ষণ। এক–দুই–তিন–চার–অসংখ্য পায়ের জঙ্গলে প্রতি পদে আপদ–বিপদ, পদস্খলনের সম্ভাবনা তৈরি রাখতে রাতের ঘুম বরবাদ। ভয় আছে মনে, তাই এত চিন্তা। ভয়ই যে নেতি–র জন্মস্থান। সেই নেতি–কে ইতিবাচক ছাপ দিতে নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলা। আসলে তো, ওভাবে হারলে ‘আমার যে কী হবে’! আমি কোচ, কিছুই করতে পারব না? গড়তে না হয় নাই–বা পারলাম, ভাঙতে ক্ষতি কী? বিশ্বকাপ যেন সামনে একটাই লক্ষ্য রেখে ছুটছে। না, জেতার লক্ষ্যে নয়। কী করে রোজারিও–র মেসিকে রোজ খেলতে না–দেওয়া যায়, কী করে আটকে দেওয়া যায়, মেরে–ধরে, কৌশলে।



কিন্তু, পারা যাচ্ছে না। গেরিলা যুদ্ধ চলছে। চোরাগোপ্তা লাথি–ঘুষি–কনুই বর্ষণ। বল ছিনতাইয়ে ছলই বল! সেখানে আকাশি–সাদা ডোরা, পিঠে দশ নম্বর, অবিচল নিজের লক্ষ্যে। নিজের অস্ত্রে শান দিচ্ছেন রোজ। কখনও পা–ছুরির তীক্ষ্ণতায় ঝলসে যাচ্ছে চোখ, কখনও পায়ে তুলে নিচ্ছেন তুলি। মেঘনাদ হয়ে মেঘের আড়াল থেকে নয়, তাঁর যুদ্ধ সূর্যের আলোয়, সরাসরি, সামনাসামনি। ‘আমার পায়ে বল, বুকেও। কেড়ে দেখাও’, ছুড়ছেন চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ নিতে বাকিরা ছুটছেন আইনের পথ এড়িয়ে, চোরাগলি দিয়ে!

জীবন তো এমনই। সবাই সুন্দরের পূজারী হতে পারেন না, কুৎসিত–এরও ‘প্রোমোটার’ থাকেন, এই বিশ্বেই।

তবু, নিকষ কালো রাত পেরিয়ে, ‘প্রতিদিন সূর্য ওঠে তোমায় দেখবে বলে’ — মেসি!
প্রকাশিত : আজকাল, বিশেষ বিশ্বকাপ সংখ্যা, ১ জুলাই ২০১০

Monday, June 23, 2025

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / অপমানিত মাতৃসত্তা এবং ক্রীড়াজগৎ

** আজ ২৩ জুন দুজনের জন্মদিন। প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের ছোঁয়াচ থেকে অনেক দূরে এখন। জিনেদিন জিদানের কাছাকাছি তো স্বপ্নেই যাওয়া যায় শুধু...



এক মহিলার দৃষ্টিকোণ থেকে আর এক অপমানিত মাতৃসত্তার প্রতি সহমর্মিতা।
অসম্ভব প্রাণবন্ত লেখা, সাবলীল শাণিত যুক্তি। ভাষা, পুরুষ হলেও, সরাসরি বেঁধে বুকে, কারণ, মহিলার্বিশেষে সর্বজনীন সেই আবেদন। বাংলার গায়ক কবীর সুমন তো কবেই গেয়েছিলেন, ‘তোমার শরীরে আমার আদর বৃষ্টির মতো ঝরে/ ওদিকে নপুংসকেরা কাউকে গণধর্ষণ করে।’ প্রণম্য সেই ভাবনা এবং সেই ভাবনার শালীন প্রকাশভঙ্গি।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের লেখিকা সু মট-এর লেখার প্রতিপাদ্য ছিল, মিসেস সাইমন্ডস, অ্যান্ড্রু সাইন্ডস-এর মা, আপনার মাতৃসত্তাকে কি অবমাননা করলেন হরভজন সিং?
কোনও সন্দেহ নেই, সুবিচার করেননি হরভজন। বিশেষত সেই ছেলে যাঁর মনে এখনও মায়ের প্রতি সেই ভক্তিভাব যা তাঁকে দিয়ে মাকে ফোন করায়, যখনই কোনও সমস্যায় পড়েন। এমনকি, আপিলস কমিশনারের কাছে মুক্ত ঘোষিত হওয়ার পরও।
কিন্তু যে ভাবে প্রাণখুলে সমর্থন জানানো উচিত ছিল, মন থেকে সেই সায় পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সহজবোধ্য। সু মটের লেখনী আশ্চর্যরকম নীরব আর একজন সম্পর্কে – ব্র্যাড হগ।
ভারতীয় ক্রিকেটারদের ‘বাস্টার্ড’ বলেছিলেন হগ, বাংলায় যা বেজন্মা। আক্ষরিক অর্থ বলছে, একই অপরাধ। মাতৃত্বের অবমাননা যদি ‘তেরি মা-কি’ গালাগালিতে থাকে, বেজন্মা শব্দেও আছে, হয়ত আরও বেশিই। সু মট, আপনার সেটা মনে হল না?
লেখকের নিরপেক্ষতার শর্ত মেনে নিলে হরভজন যে-অপরাধে দোষী, হগও। তাই একযাত্রায় পৃথক ফল করে সু মট, আপনি ব্যর্থ হলেন আপনার সেই লেখায় আপামর মাতৃজাতির অসম্মানের পাশে কলম খুলে দাঁড়াতে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আপনার কলম তখন শুধুই ধরে তুলল আপনার ভারত-বিদ্বেষ, বোধহয়, আরও বড়, অশ্বেতকায় বিদ্বেষের কথা, বকলমে সোচ্চার হল ঘোষণায়, ‘কী সাহস! কালো চামড়ার লোক সাদা চামড়ার মায়ের ইজ্জত নিয়ে প্রশ্ন তুলবে?’ (যদিও সাইমন্ডস কৃষ্ণাঙ্গ, কিন্তু অস্ট্রেলীয়!)
মায়ের কোনও গায়ের রঙ নেই, থাকে না, হয় না, মহিলা হয়েও বুঝলেন না সু মট? ফিরবেন নাকি বাঙালি নাগরিক কবিয়ালের কাছে? ‘একই জল একই পানি / সাগরে সাগরে নাচে / প্রথমমায়ের প্রসব বেদনা / পৃথিবীর মনে আছে / কেউ সাদা কেউ কালো / রঙিন বলেই ভালো /রঙমশালটা একলা জ্বেলো না / আমার বুকেও জ্বালো...’



২
২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন দুয়েক পর এক ফরাসি কাগজের প্রশ্ন ছিল, ‘জিনেদিন জিদান, আপনার সন্তানের সামনে মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবেন তো আপনি?’
সেদিনও বুঝিনি, এখনও বুঝি না, কেন দাঁড়াতে পারবেন না জিদান, তাঁর সন্তানের সামনে মুখ তুলে, কী অপরাধে!
জিদান কি কোনও অপরাধ করেছিলেন? কোনও এক মার্কো মাতেরাজ্জি প্রথমে তাঁর স্ত্রী, পরে তাঁর বোনকে অপমানের পর, শেষে তাঁর সেই সকালে হাসপাতালে ভর্তি–হওয়া মা–কে বলেছিলেন ‘টেররিস্ট হোর’। তাঁর বুকে ঢুঁসো না–মারলে আর কী করতেন জিদান?
খুব সহজ প্রশ্ন, যে–কোনও কারণেই হোক, কেউ আপনার তিন ভালবাসার পাত্রী সম্পর্কে এইভাবে চরম অশ্লীল ইঙ্গিত ক্রমাগত করে গেলে কী করতেন আপনি?
বরঞ্চ, পাল্টা প্রশ্ন থাক ছাপার অক্ষরেই, নিজের সন্তান বড় হওয়ার পর তাঁর মুখের দিকে তাকাতে পারবেন কি মাতেরাজ্জি, বলতে পারবেন কি কীভাবে এসেছিল তাঁর বিশ্বজয়ের কাপ, যা নিয়ে বুকে জড়িয়ে শুয়ে ছিলেন, সস্নেহ চুম্বন এঁকে দিয়েছিলেন যার গায়ে বিশ্বজয়ের মুহূর্তে? তাঁর সন্তান তাঁকে প্রশ্ন করলে কী জবাব থাকবে মাতেরাজ্জির কাছে তখন? কিংবা, তাঁদের মা–কে কেউ ‘টেররিস্ট হোর’ বললে বাবাকে ছেড়ে জিদান–পন্থী হয়ে সেই বক্তার টুটি টিপে ধরার ইচ্ছে যদি সেই সন্তানের না–জাগে, সন্তান কেন?
ফুটবল খেলেন বা কোনও খেলা খেলেন বলেই নাকি আপনি অ–মানবিক! বলা হবে, ‘এ তো স্ট্র্যাটেজি, কৌশল। ফাঁদ–পাতা, যাতে আপনি ফাঁদে পা দিয়ে ভুল করেন, বিপক্ষ জেতে। এ নিয়ে এত তত্ত্বকথা কীসের?’
না, না এবং না।
খেলছেন বলেই যে কোনও বিপক্ষের মৌখিক অধিকার থাকবে আপনার প্রিয়তমার ‘জার্সি খুলে নেওয়ার’, এই অধিকার কেউ কাউকে দেয়নি। খেলা পার্থিব সমাজ–বহির্ভূত, মঙ্গল গ্রহের কোনও বস্তু নয়। খেলার আইনও সভ্যতার পরিপন্থী হতে পারে না বা সভ্যতার সীমারেখা লঙ্ঘনের অধিকার পেতে পারে না যেমন, কোনও অদক্ষতার পরিপূরকও হয়ে উঠতে পারে না কখনও।
মানবিক স্বতঃস্ফূর্ততার স্বাভাবিক প্রকাশ খেলার মাঠে। নিবিড় অনুশীলনে সেই দক্ষতা নিপুণতর করে তোলার বাহ্যিক মাধ্যম খেলা। সেখানে এই সভ্যজগত বহির্ভূত অনাচার কেন? কেন অক্লেশে কেউ কাউকে ক্রমশ যা–ইচ্ছে–তাই বলেই চলবেন আর অন্যপক্ষকে শুনে যেতেই হবে, দক্ষতার হিসেবে এগিয়ে থাকার ‘অপরাধে’?
‘কিন্তু, খেলার মাঠে অমন তো হামেশাই হয়!’
যেন হামেশা যা হয়, সব ভাল! তা হলে গ্যালিলিওকে অন্ধ হতে হবে কেন, সত্য বিশ্বের চোখের সামনে আনার জন্য? বিশ্ব তো তেমনই জানত, সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে!
‘খেলতে এসেছিস, বাচ্চা না মেয়ে? পুরুষালি খেলা, লাথি–কনুই খেতে হবে, গালাগাল খেতে হবে, পারলে ফিরিয়েও দিতে হবে, তবেই না! খেলতে এসে গালাগাল শুনবি না, এই মেয়েলি কান্নাকাটির কোনও মানে হয়?’
যেন গালাগাল পৌরুষের প্রতীক!
নিজের সীমাবদ্ধতা ঢাকতে আর কত নীচে নামব আমরা? চুরি করব, আইন দেখতে পায়নি বলে ফাঁক খুঁজব, খেলোয়াড়ের জন্ম–বর্ণ নিয়ে প্রশ্ন তুলব, তুলতেই থাকব, থুথু ছেটাব, অভিনয় করব, যাকে দেখতে পারি না, চলন বেঁকা বলে অভিযোগ আনব, আর, বলে যাব ‘স্ট্র্যাটেজি’ — শত ধিক এমন পৌরুষে!



৩
বড় ম্যাচের আগে পিকে ব্যানার্জির বহুল প্রচারিত ভোকাল টনিকেও সেই ‘মা’!
জার্সি মাটিতে রেখে দিতেন। বলতেন, ‘জার্সি তোমাদের মা, আর সেই মায়ের সম্মান নিয়ে টানাটানি করতে চাইছে কেউ, তোমরা কি মুখ বুজে সহ্য করবে?’
সাতের দশকের অনেক ফুটবলারের মুখেই শোনা, শুনেই চেগে যেতেন, অসহ্য রাগ ভর করত, ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হত বিপক্ষকে। এখন, এত দিন পর, সেই ভোকাল টনিকের তেজ কমেছে বহু ব্যবহারে। তবু, এখনও কোনও কোনও বিশেষ মুহূর্তে তা রীতিমতো কাজে দেয়, অনেকে এখনও এই বিশেষ আর্তিতে উদ্বুদ্ধ হন, ভালই তো।
আবার, সেই মায়ের সম্মানার্থে মাঠে নেমে বিপক্ষের কোনও ফুটবলারকে সেই ‘মা–মাসি উদ্ধার করে দেওয়া’ গালাগাল করতেও কি পিছপা হয়েছিলেন বা হয়েছেন কেউ কখনও? তা হলে, লাভ কী? এক মায়ের সম্মান রক্ষার্থে নিজে লড়ছেন, আবার সেই মায়ের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে গিয়ে বিপক্ষকেও তো তাতিয়ে দিচ্ছেন, লাভ কার?
কেন এমন হবে না যে, মানুষকে তাতিয়ে তোলার জন্য আদিম প্রবৃত্তির ব্যবহার করাই ছেড়ে দেবে ক্রীড়া জগৎ?
উত্তেজনার বশে অনেক কিছুই হয়ে যাওয়া আর অশ্লীল গালিগালাজে নিজেদের উদ্দীপ্ত করা, এক হতে পারে কখনও, নাকি হয়?



কেন ফুটবল মাঠে নামার সময় মার্কো মাতেরাজ্জিকে ভাবতে হবে, জিদানকে কী কী বলে তাতানো যায়, কেন গ্লেন ম্যাকগ্রাথকে মনে রাখতেই হবে, কোনও এক বিশেষ সময় রামনরেশ সারওয়ানের বউ–এর কথা তুলতেই হবে, কেন হরভজন সিং–এর বল খেলতে না–পারলে রিকি পন্টিংকে আনতেই হবে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ, কেনই বা ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডকে আটকাতে না–পেরে তাঁর গায়ের রঙ তুলে গাল পেড়ে থুথু ছেটাতে বাধ্য করতে হবে রুডি ফোলারকে এবং সেই কাজে সায় থাকবে কাইজার বেকেনবাওয়ারের?
এবং, আরও বড়, জিদান–গাভাসকারদের দৃষ্টান্তমূলক প্রতিবাদ সত্ত্বেও, এমন ঘটনা কি চলতেই থাকবে, আজও, গোটা পৃথিবী জুড়ে?
বন্ধ হবে না খেলার মাঠের এই মাতৃ–দূষণ?
প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তর, আজও অজানা!
*প্রকাশিত, খেলা ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৮

Saturday, June 21, 2025

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / বিস্ময়াবিষ্ট ৫৫ বছর

 


২১ জুন, ১৯৭০। ফুটবল হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল স্বতঃস্ফূর্ততার আনন্দে। সে বড় আনন্দের দিন। আজ  তার বয়স পঞ্চান্ন।

ব্রাজিলের কোনও কবীর সুমন নিশ্চয়ই লিখেছিলেন পর্তুগিজ ভাষায় - অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোনও দাবি দাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু ‘তোমাদের’ চাওয়া!

সেই চাওয়া ফুরোয় না। ফুরোয়নি এই পঞ্চান্ন বছরে। আজ, ২১ জুন, ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর রূপ চেয়ে-চেয়ে ফিরে-দেখার দিন, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগের দিন, স্মৃতির খুশিতে ভেসে যাওয়ার দিন। আরও একবার মনে-মনে, ইউটিউবের চোখে, ‘জায়েন্টস অফ ব্রাজিল’ ডিভিডি-তে – যার যেখানে খুশি। ওই যে ক্লোদোয়ালদো মাঝমাঠে হেলায় কাটাচ্ছেন চার-পাঁচ নীল জার্সিকে। ওই যে তোস্তাও, বলটা তুলে দিলেন। ওই যে রিভেলিনো, ওই যে জাইরজিনিও, লম্বা লম্বা ‘স্ট্রাইড’। ওই যে বলটা দিলেন পেলেকে, বক্সের ঠিক বাইরে। আর ওই তো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পেলের সেই ব্লাইন্ড-পাস! ক্যামেরা কোন ছার, মানসচক্ষেও দেখা যায়নি কোত্থেকে দৌড়ে আসছেন কার্লোস আলবের্তো তোরেস। তাঁর পৌঁছনোর সময়জ্ঞান কম্পিউটারের চেয়েও নিখুঁত, অথচ একটুও যান্ত্রিক নয়। তাঁর ডানপায়ের শটে ফুটবলের কাতানেচ্চিও-মুক্তির অবিস্মরণীয় আনন্দ!

তাঁরা শুধুই ফুটবল খেলেছিলেন। পা দিয়ে, মাথা দিয়ে। আর অবশ্যই, হৃদয় দিয়ে।

সর্বকালের অন্যতম সেরা নিয়ে বিতর্ক আছে, থাকবেও। কিন্তু যা নিয়ে নেই, ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল খেলেছিল সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল।

সেই সবচেয়ে সুন্দর ফুটবলের পঞ্চান্ন বছর পূর্তি আজ। মেহিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ফাইনালে কাতানেচ্চিও-ইতালি দুরমুশ ৪-১। নেতির বিরুদ্ধে ইতি-র জয়, ফুটবলকে শৃঙ্খলিত করে তোলার ইউরোপীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ততার জয়। মাঠে মনের আনন্দে স্বাভাবিক-স্বতঃস্ফূর্ত ফুটবল খেলার সেই আনন্দ উদযাপন। বিশ্বফুটবল সেই বিশ্বকাপ জয় মনে রেখেছে সানন্দ!

মনে রাখবে না-ই বা কেন? আর কোন্ বিশ্বকাপ দিয়েছে স্মৃতিতেও এমন নিষ্কলুষ ছলচাতুরিহীন আনন্দে ভেসে-যাওয়ার সুযোগ?

সেই জন্যই তো সত্তর বিশ্বকাপের শাশ্বত সত্য হিসাবে যে তিনটি মুহূর্ত উঠে আসে, তিনটিই শেষ হয়েছিল আপাত-ব্যর্থতায়। আপাত, কারণ, সেই মুহূর্তে ব্যর্থ। কিন্তু, পঞ্চান্ন বছরের স্মৃতিতে অবিনশ্বর!

তিন নম্বর গ্রুপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ চেকোস্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে। ১১ মিনিটেই গোল খেয়ে পিছিয়ে ব্রাজিল। কিছু ভিডিও দেখেছিলেন পেলে, চেক দলের। চেকোস্লোভাকিয়ার ফুটবলেতিহাসের সেরা গোলরক্ষক ইভো ভিকতর-এর স্বভাব ছিল, বল বিপক্ষের অর্ধে থাকলে এগিয়ে দাঁড়ানোর, বক্সের মাথায়। ক্লোদোয়ালদোর থেকে বলটা পেয়েছিলেন পেলে, নিজেদের অর্ধেই, মাঝমাঠে। চোখ তুলে দেখেছিলেন, যা ভেবেছেন তা-ই। বক্সের মাথায় দাঁড়িয়ে ভিকতর। কালবিলম্ব করেননি। ৬৫ গজ দূর থেকেই তুলে দিলেন বল, বিপক্ষের গোলের ঠিকানায়! ভিকতরের তখন জামানত বাজেয়াপ্ত। কোনওরকমে পড়িমরি পেছনে-ছোটা। হাজার তিপ্পান্নর জালিসকো-গ্যালারির চোখের পাতা পড়ছে না। ভিকতর পৌঁছতে পারলেন না, বল পৌঁছল তাঁর আগেই। কিন্তু পেল না জালের আশ্রয়। আসলে পেতে পারত না। এ যে এক অনির্দেশ্য যাত্রা! নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো মাত্রই তো যাত্রা শেষ হয়। তার তখন সত্যিই আর কোনও পর নেই। কিন্তু, পেলের সেই শট গোলে পৌঁছয়নি বলেও আজও সে ভ্রাম্যমান ফুটবলপ্রেমীর মনে। এখনও সেই বল চলেছে তার সেই কক্ষপথে। পেলে যেমন আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘কতবার দেখলাম শটটা তারপর। কী মুশকিল, একবারও পথ পাল্টে গোলে গেল না, এখনও!’

১৩ নম্বর ‘পেলে’, আগে কখনও দেখেছেন? ছবিটা সানতোস-এর জাদুঘরের দেওয়াল থেকে

দ্বিতীয় ম্যাচে সামনে ইংল্যান্ড। কার্ডাসীয় সত্য যা-ই হোক, তথ্যের খাতিরে লিখতেই হবে, আগের বারের (১৯৬৬) বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ব্রাজিলের কোচ মারিও জাগালো ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন ফুটবলারদের, এই ম্যাচে সাম্বার প্রত্যাশা না-করতে। কারণ, গোল পেতে অপেক্ষা জরুরি, বিপক্ষে যখন ববি মুরের নেতৃত্বে রক্ষণ। জাগালো-কে ভুল প্রমাণিত করে ফেলতেই পারতেন পেলে। জাইরজিনিও মাটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন টেরি কুপারকে। ক্রস এল পেনালটি বক্সে। বাবা দোনদিনিও-র ছোটবেলার ট্রেনিং, সেকেন্ডের বাড়তি ভগ্নাংশ বাতাসে ভেসে-থাকায় সিদ্ধকাম পেলে উঠলেন, দেখলেন, খোলা-চোখে জোরালো হেড, নিখুঁত কপালে-বলে সংযোগ, নিশ্চিত গোলে বল, কোত্থেকে উড়ে এল গর্ডন ব্যাঙ্কসের হাত, তুলে দিল বলটা, বারের ওপর দিয়ে। ‘এতটা অপছন্দ সেই মুহূর্তে আর কাউকে করিনি, গর্ডন। পরে, এতটা পছন্দও আর কাউকে করিনি। ওই বিশ্বকাপের তো বটেই, সব বিশ্বকাপেরই সেরা সেভ বোধহয়’, স্বীকারোক্তিতে অকপট পেলে। ব্যাঙ্কস পরে বলবেন, তিনি যখন বলের উদ্দেশে শরীর ছুড়ে দিচ্ছিলেন তখনই শুনতে পেয়েছিলেন পেলে বলে উঠেছিলেন ‘গোল’!

ব্রাজিলের পঞ্চম ম্যাচ সেমিফাইনাল, সামনে উরুগুয়ে। তখনও ব্রাজিলের সবচেয়ে ঘৃণিত শত্রু। পঞ্চাশের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে সেই অপ্রাপ্তি। এক গোলে এগিয়েও ১-২ হার, যে কারণে ব্রাজিলের ফুটবল-মননে আমরণ কারাবাস গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসার। ‘মারাত্মক মারাকানা’-র সজল স্মৃতি ব্রাজিলীয়র সঙ্গী আজীবন। কুড়ি বছর পর সুযোগ এবার। গলায় আটকে-থাকা সেই কুড়ি বছরের অস্বস্তির সমূল উৎপাটন জরুরি।

আবারও ০-১ পিছিয়ে, আবারও পেলে। থ্রু এল তাঁর জন্য, তোস্তাও-এর। উরুগুয়ের গোলরক্ষক লাদিস্লাও মাজরুকিয়েউইচজ এগিয়ে এলেন বাধা দিতে। পেলের অবিস্মরণীয় ‘ডামি’। বলটা ধরব-ধরব করেও ধরলেন না! ছেড়ে, দিলেন সোজা দৌড়। লাদিস্লাও মাটিতে হাঁচড়পাঁচড়। কী হল বোঝার আগেই পেলে ঘুরে বলের দখল নিয়ে ফেলেছেন তখন, তেকাঠির ডানদিকে। কৌণিক সম্ভাবনায় অসম্ভব এমন জায়গায়। কিন্তু সামনে যে ফাঁকা গোল! পেলের ডান পায়ের শট কোনাকুনি। মাঠ এবং অসহায় তিনকাঠিকে ফাঁকা রেখে বল দূরের পোস্ট ছুঁই-ছুঁই বাইরে, দীর্ঘশ্বাস! পেলের প্রতিক্রিয়া দেখুন ইউটিউবে। এক মুহূর্তের জন্য বিমূঢ়। নিজের ক্ষমতায় ক্ষণিকের অবিশ্বাস যেন। এমন ভাবনাও গোলে গেল না!

যেতে পারত না। গেলে এই ইতিহাস হত না বলেই। শেলির কথামতো, সবচেয়ে মিষ্টি স্মৃতিগুলোই যে আসলে সব দুঃখের! কিন্তু, দুঃখই বা কীসের, কেন? অপূর্ণতার মধ্যেই যে পূর্ণতার আনন্দ, সীমার মাঝে অসীমের সুর। গোল মানে পরিণতি, শেষ। এই অপ্রাপ্তিই আসলে সম্পূর্ণ করে প্রাপ্তির ঘড়া। জীবন, এমনই ব্যথাদায়ক। একই সঙ্গে ব্যথাহর!

মারিও জাগালো কোচ হয়ে এসেছিলেন বিশ্বকাপের মাত্র মাস তিনেক আগে। তার আগে ছিলেন হোয়াও সালদানিয়া। ফুটবল-সাংবাদিক হিসাবে এমন কড়া সমালোচনা করছিলেন ব্রাজিলের জাতীয় দলের খেলার ধরনের, ব্রাজিলীয় ফুটবল সংস্থা তাঁকেই কোচের দায়িত্ব দিয়ে দেয়! আর তিনিও, মিলিটারি-শাসনের আমলে নিজেকে কমিউনিস্ট পরিচয় দিতে অহংবোধের গোঁয়ার্তুমিতে ডুবে, ইচ্ছেমতো চলতে গিয়ে ডেকে এনেছিলেন বিপর্যয়। পেলে নাকি অন্ধ! বেশি দূর দেখতেই পান না, সরাসরি জানিয়ে ছিলেন। বসিয়ে রাখতেন, বাদ দিতে চেয়েছিলেন, ১৩ নম্বর জার্সিও পরিয়েছিলেন পেলেকে, যে-ছবি জ্বলজ্বল করছে সানতোসের পেলে-জাদুঘরে, পাশে সালদানিয়ার কথা, দেখে এসেছিলাম ২০১৪ বিশ্বকাপের সময় সানতোস গিয়ে। সালদানিয়ার চাকরি যখন চলে যাবে নিশ্চিত, সাংবাদিক সম্মেলনে আরও একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছিলেন পেলে সম্পর্কেই – এমন রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে যা প্রেসকে জানানো অনুচিত। রেগে অগ্নিশর্মা পেলে সেই সময় দলের দুই ডাক্তারের কাছে ধর্না দিয়ে রিপোর্ট বের করে নিজে দেখে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু, কেউ কেউ এখনও সালদানিয়ার সেই কথা ধরে পেলের বিরুদ্ধে সেই ‘অজানা’ রোগের কথা তুলে এনে খেলো করেন সেই নজিরবিহীন সাফল্যকে। সর্বোচ্চ আলোকোজ্জ্বল প্রতিযোগিতার পঞ্চান্ন বর্ষপূর্তিতে ওই সব থাক আড়ালে। ক্ষণিকের তরে যা সূর্যকে আড়াল করতে পারে, ওইটুকু ভেবেই সাফল্যের আড়মোড়া ভাঙুন তাঁরা। আর, আমরা সেই কাজলকালো মানিকের হাস্যোজ্জ্বল ছবিতে খুঁজে নিই বেঁচে থাকার আনন্দ।

ডানদিকে হোয়াও সালদানিয়া। চোখে-আঙুল দাদা! পেলের সমস্যা নাকি চোখে, ভাল করে দেখতে পান না, অভিযোগ তুলে বাদ দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর ব্রাজিলের কোচ হওয়ার গল্পটাও অবিশ্বাস্য। ছিলেন সাংবাদিক, এত সমালোচনা করেছিলেন যে ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন তিতিবিরক্ত হয়ে তাঁকেই কোচ করে ফেলেছিল!

প্রাপ্তি সম্পূর্ণ হয় ফাইনালে। সামনে ইতালি। দক্ষিণ ইউরোপের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকা। যারা জিতবে, সোনার পরী জুলে রিমে কাপ চিরকালের জন্য ঘর করতে যাবে তাদের দেশে। ইতালি তখন এক আর্জেন্তিনীয় এলেনিও এরেরা-র (অ)কল্যাণে পেয়ে গিয়েছে পরশপাথর – কাতানেচ্চিও। ১৯৯৭, যুবভারতীতে, এক লক্ষ ৩১ হাজার দর্শকের সামনে মোহনবাগানের হীরেকে কাঁচে পরিণত করে প্রদীপ ব্যানার্জি বুঝিয়েছিলেন আমাদের, ‘ইতালীয় কাতানেচ্চিও জানো? গাড়িতে শক-অ্যাবজর্বার বলে একটা জিনিস থাকে যা গাড়িকে নিরাপদ রাখে যাবতীয় ঝড়ঝাপটা সামলে। কাতানেচ্চিও হল তা-ই। ডেকে আনতে হয়। ঝাপটা সামলাতে হয়। তারপর, রাস্তা ফাঁকা দেখলেই, ব্যস!’ বিপক্ষের আক্রমণ সামলাতে সামলাতে বিপক্ষ যখন সবচেয়ে বেশি বেসামাল, দুরন্ত গতির প্রতি আক্রমণে একটা গোল দিয়ে আবার সবাই পেছনে। পাঁচ ম্যাচে চার গোল খেয়ে, রক্ষণে-সেরা দল ফাইনালে আক্রমণে-সেরা দলের বিরুদ্ধে আজতেকায়, ২১ জুন ১৯৭০।

এক লক্ষ সাত হাজার দর্শকের সামনে পেলে ফিরে গিয়েছিলেন ১৯৫৮-র ফাইনালে। সেই লাফিয়ে-ওঠা, এবার রিভেলিনোর পাসে মাথা ছোঁয়াতে। আর শেষটা? মহাকাব্যিক পরিণতি। ব্রাজিলের অধিনায়ক কার্লোস আলবের্তো তোরেস-এর পায়ে, এখনও যার পরিচিতি বিস্ময়-গোল। মাঠের এগারর মধ্যে ন’জন ব্রাজিলীয়র পায়ের ছোঁয়া ছিল সেই গোলে। অনেক পাসের গোল এখন পেপ গারদিওলা প্রভাবিত ফুটবলে মাঝেমাঝেই দেখা যায়। বিশ্বকাপ ফাইনালে দলের ন’জনের পা ঘুরে গোল তবুও ব্যতিক্রম! ঠিক একইভাবে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও জাইরজিনিও-র জন্য সাজিয়ে দিয়েছিলেন পেলে। তবে সেই ম্যাচে পাসটা ছিল বক্সের মধ্যে এবং জাইরজিনিও ছিলেন কাছেই। সত্তর বিশ্বকাপের এই শেষ গোলের সময় আক্রমণ শুরু হচ্ছে যখন কার্লোস কোথায়? মাঠের ডানদিকে তিনি তখন কিছু না-করায় ছদ্মব্যস্ত!

ইতালির বিরুদ্ধে এমন ট্যাকটিক্যাল গোলেও হয়ত বুঝিয়ে-দেওয়া, স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে কৌশলকেন্দ্রিক হওয়ার কোনও বিরোধিতা নেই। কোচ জাগালো বলেই দিয়েছিলেন, ইতালি রক্ষণের বাঁদিকে ফাচেত্তি থাকেন এবং রিভেলিনো-তোস্তাওয়ের সঙ্গে জাইরজিনিও যদি নিজেদের বাঁদিকে চলে যান, ইতালীয় রক্ষণ সম্পূর্ণ বামপন্থী হয়ে পথ হারাতে বাধ্য। ডানদিকে খুলে যাবে, পেলের ‘ইংরেজি’ আত্মজীবনীর শব্দে ‘অ্যাভিনিউ’। সেই রাস্তা ধরে উঠে আসতে হবে, প্রবল গতিবেগে, ডানদিকের ডানা মেলে অধিনায়ককে। কেল্লাফতে সম্ভব সেভাবেও। আর এই রাস্তাটা, সানতোসে চিরকাল একসঙ্গে খেলতে-খেলতে মুখস্ত পেলে-কার্লোসের।

২০১৪ বিশ্বকাপের আগে কলকাতায় বিশ্বকাপ নিয়ে এসে কার্লোস যা এই প্রতিবেদককেও বোঝাচ্ছিলেন যখন, সারামুখে অপার্থিব হাসি। পেলেকে মুখ তুলে তাকাতে হয়নি। বলটা ডানদিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ফাঁকায়। নিমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল, ‘আয় ভাই, শটটা নে, গোলটা কর্’!

সেই বিস্ময়-গোলে বিস্ময়াবিষ্ট ফুটবল-বিশ্ব এখনও, এই পঞ্চাশ বছর পরও তাই, কবীর সুমনই গাইছে, ‘বিস্ময় আজও গেল না আমার’!

৫৫ কেন, আরও কত ৫৫পেরিয়েও, থেকে যাবে অদ্বিতীয়!

 

* সব ছবি সানতোস এবং পেলে-জাদুঘরে তোলা, ২০১৪ সালে