Saturday, November 14, 2015

আর্জেন্তিনা-ব্রাজিল নিয়ে পাঁচকথা!

লাভেজির গোল, লুইজ এসে পৌঁছতে পারেননি!

কাশীনাথ ভট্টাচার্য
লুকাস লিমার গোলে এক পয়েন্ট ব্রাজিলের
সুপার ক্লাসিকো অমীমাংসিত। ৩৪ মিনিটে এজেকিয়েল লাভেজির গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্তিনা। বিপক্ষ প্রতি আক্রমণে আসছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। ব্রাজিল রক্ষণে দাভিদ লুইজ আর দানি আলভেস এমন পরিস্থিতিতে গোল খাবেন, নিশ্চিত! বহুবার খেয়েছেন, আবারও খেলেন, যখন আলেখান্দ্রো দিমারিয়ার থ্রু খুঁজে পেল ইগাইনকে। আলভেস নিজের জায়গায় থাকেন কখনও কখনও। ওপরে উঠে নিচে তাড়াতাড়ি নামতে না-পেরে দৃষ্টিকটু ফাউলও করেন, আবার পায়ে বিপক্ষের কারও পা লাগলে ‘বাবা রে, মা রে’ বলে পা চেপে ধরে গড়াগড়িও যান। লুইজও নিজেকে ওপরে দেখতেই ভালবাসেন। সোজা নামছিলেন তিনি, কোনাকুনি আলভেজ। ইগাইনের বাড়ানো বল অবহেলায় খুঁজে নিল লাভেজিকে। পিএসজি-র স্ট্রাইকার ভুল করেননি। ৫৮ মিনিটে ১-১ ব্রাজিলের লুকাস লিমার। আলভেজের সেন্টারেই গোলের মুখ খোলে। মাঠে সদ্য-আসা দগলাস কোস্তা (কেন প্রথম থেকেই নয়?) সেই সেন্টারে জোরালো হেড করেছিলেন যা বারে লেগে ফিরে আসে বক্সের মধ্যে। সানতোসের লিমার শটে রোমেরো পরাস্ত। দু’মিনিটে দু’বার হলুদ কার্ড দেখে দাভিদ লুইজের বেরিয়ে-যাওয়া, ৮৬ মিনিটে। 
ম্যাচের বাকি পাঁচ কথা -

দিমারিয়ার ১০

চকচক করলেই সোনা হয় না যেমন, দশ নম্বর জার্সি পরলেই পেলে হওয়া যায় না, প্রবাদের মতোই সহজ সত্য। কোনও কোনও দশনম্বরী তো আবার পিঠে জার্সি ঝুলিয়েই নিজেকে পেলের চেয়েও বড় ভেবে ফেলতেন, অনায়াসে! এখানে তেমন হয়নি। কিন্তু, আর্জেন্তিনা-ব্রাজিল ম্যাচ টিভিতে দেখতে বসেই তাজ্জব। আলেখান্দ্রো দিমারিয়ার জার্সি নম্বর দশ কেন? এই আর্জেন্তিনা দলে দশ নম্বর জার্সির মালিক তো এখনও অবসর নেননি! অনুপস্থিতিতে অধিনায়কের আর্ম-ব্যান্ড কাউকে না কাউকে পরতেই হয়, নিয়ম। আঘাতের কারণে অনুপস্থিতিতে জার্সি নম্বরের মালিকানাও কি পাল্টে যায়? বলিহারি আর্জেন্তিনা দলের পরিচালকদের বুদ্ধি! দিমারিয়া অবশ্য চেষ্টা করেছিলেন দশের মান রাখতে। ইগাইনকে পাসটা মনে রাখার মতোই। কিন্তু, মোরিনিওর রেয়াল মাদ্রিদে থাকার সময় রোনালদোকে প্র্যাকটিসে দেখে-দেখে ফুলের ঘায়ে মুচ্ছো যাওয়ার রোগটা এখনও রয়েছে। গত বছর চারেকে তেমন বিসদৃশ কিছু না-ঘটলেও, আর্জেন্তিনার ‘দশ’-এর এমন ইতিহাস অবশ্য মোটেই বেমানান নয়। বিশেষত যাঁদের মনে আছে ১৯৯০ বিশ্বকাপের কথা!

‘অপরাজিত’ দুঙ্গা!


এক পয়েন্ট এল। স্বস্তি দুঙ্গার। হারতে হল না যে! সামনে এবার পেরু। খেলাও ঘরের মাঠে। ৩ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট সঙ্গে। পেরুকে হারাতে পারলে ৪ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে বেশ খানিকটা উঠে আসা যাবে। বুয়েনস আইরেসে আগের ২৮ ম্যাচে ১৪ হার ছিল ব্রাজিলের। এবার আর হারতে হয়নি। তা ছাড়া, আর্জেন্তিনার কাছে এবারও হারলেন না কোচ দুঙ্গা। আগের ৫ ম্যাচে ৪ জয় ও ১ ড্র ছিল। শেষ যেবার আর্জেন্তিনায় এই দুই চিরশত্রু দেশ খেলেছিল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে, সেই ২০০৯, মেসির জন্মশহর রোজারিওতে দিয়েগো মারাদোনার প্রশিক্ষণে থাকা আর্জেন্তিনাকে ৩-১ হারিয়েছিল দুঙ্গার ব্রাজিল। এবার না জিতলেও টানা ৬ সুপারক্লাসিকোয় অপরাজিত, চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়লেও পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট হবেন দুঙ্গা, নিশ্চিত! কিন্তু যা মানা কঠিন, থিয়াগো সিলভার না-থাকা। নেইমারকে অধিনায়ক করবেন বলে থিয়াগোকে বাদ দিয়েছেন দুঙ্গা। গোলে তথাকথিত বয়স্ক জেফারসনকে সরিয়ে তরুণতর আলিসনকে খেলানোর সিদ্ধান্ত যদিও সমর্থনযোগ্য, থিয়াগোকে বাদ দিয়ে ব্রাজিলের সেন্ট্রাল ডিফেন্স এখনও চূড়ান্ত নড়বড়েই।

অস্বস্তিতে তাতা মার্তিনো


৩ ম্যাচে ২ পয়েন্ট। তার মধ্যে ঘরের মাঠে দুটো ম্যাচ হয়ে গেল। যদিও দুটোই বেশ কঠিন ছিল, কিন্তু শুনবে কে? এবার আবার সামনে হামেস রদরিগেজ-এর কলম্বিয়া, তা-ও আবার কলম্বিয়াতে। মেসি-আগেরো-তেভেজ নেই সেখানেও। কোচ চাইবেন তিন পয়েন্ট। কিন্তু, এক পয়েন্ট এলেই যথেষ্ট, জানেন খুব ভাল করে। হারলে কিন্তু চাকরি বাঁচানো চাপ। এমনিতে দক্ষিণ আমেরিকায় ১৮ ম্যাচের বাছাইপর্ব। কলম্বিয়ার কাছে হেরে গেলেও ১৪ ম্যাচ থাকবে হাতে। কিন্তু তখন তাতা-র হাতে চাকরি থাকবে কিনা সন্দেহ‌!

জার্সিবদল


লিওনেল মেসির অনুপস্থিতিতে আর্জেন্তিনার অধিনায়কত্ব করলেন হাবিয়ের মাসচেরানো, ব্রাজিলের নেতৃত্বে ফিরলেন নেইমার। দুই ক্যাপ্টেন আবার বার্সেলোনায় সতীর্থ। ম্যাচ শেষে মাসচেরানো এসে জড়িয়ে ধরলেন নেইমারকে। নেইমারই বললেন মনে হল, জার্সি বদলানোর কথা। দুই ক্যাপ্টেন বদলালেনও জার্সি। দিমারিয়া বা লাভেজির সে-সুযোগ ছিল না। তাঁদের পিএসজি সতীর্থ লুইজ লাল কার্ড দেখে আর মাঠে থাকতেন কী করে!

মেসি এবং আর্জেন্তিনা



ফিরেই দেখবেন, আর্জেন্তিনা হয়ত ৪ ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে দশ দেশের তালিকায় অষ্টম বা নবম স্থানে। দেশকে কাঁধে করে বিশ্বকাপের মূলপর্বে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে, হাসিমুখে। আর্জেন্তিনার মিডিয়ায় তখন সমস্বরে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ আর্তনাদ। পরের ১৪ ম্যাচে নিজের মতো করে খেলে হাসি ফোটাবেন। রাশিয়ায় পৌঁছন নিশ্চিত করতে গেলে প্রথম চারে থাকতেই হবে। পাঁচে থাকলে আবার প্লে অফ খেলার ঝক্কি। শেষ পর্যন্ত মেসির পায়ে তা সম্ভব হলেই ভোল বদলাবে আর্জেন্তিনার মিডিয়া। ‘দেশের হয়ে খেলায় মন নেই’ ধ্বনি উঠবে, পোঁ ধরবে ইংরেজি-মিডিয়া সমর্থিত কিছু বাঙালি বাজারি সংবাদমাধ্যমও। তাঁকে ছাড়া বাছাইপর্বেই একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ জিততে কেঁদেকঁকিয়ে একসা দল। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনালে, কোপার ফাইনালে সেই দল কী করে পৌঁছয় নিয়ে একটি শব্দও লেখা হবে না তখন। উল্টে, আবার পুরনো দায়িত্ব নতুন করে জুড়ে দেওয়া হবে, বিশ্বকাপ জেতানোর। বাড়তি প্রাপ্তি হবে কটূক্তিগুলো, আজীবন টেনে যেতে হবে মেসিকে সে-বোঝাটাও!

Post a Comment