Wednesday, October 14, 2015

হায়দরাবাদে হাবিব এখন বড্ড অভিমানী, ব্যথিতও

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

১৯৭৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি ছিলেন ম্যাচের সেরা। জীবন গিয়েছে কেটে আটত্রিশ-আটত্রিশ বছরের পার। ২০১৫-র ১২ অক্টোবর তাঁকে আর মনে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেননি কেউ!
মহম্মদ হাবিব একাই বসে আছেন হায়দরাবাদে। তাঁর সতীর্থরা, যাঁদের তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সেই দিন, মাঠে নিজেদের উজাড় করে দিতে, মঞ্চ আলো করে থাকলেন সে দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে, ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের পাশে দাঁড়ানোর হুড়োহুড়িতে। তিনি পড়ে থাকলেন দূরে। আয়োজকরা তাঁকে ডাকার প্রয়োজন মনে করেননি। আর সতীর্থরা হয়ত ভেবেই গেলেন, আয়োজকরা ঠিকই ডেকে আনবেন!
‘আমাকে জানাতে পারত। একবার টেলিফোন করলেও হত। জানতেই পারলাম না, কলকাতায় এসব হচ্ছে। আমিও তা হলে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম পেলের পাশে, আমার টিমের সবার সঙ্গে। কেউ জানালই না! মেরেকো ভুল গ্যয়ে সব’, বললেন ধরা গলায়।
অথচ, এমন সত্যিই নয় যে, সতীর্থরা ভুলে গিয়েছেন বড়ে মিঁয়া-কে। সুভাষ ভৌমিক তখনও গুয়াহাটি যাননি। পেলে-ম্যাচের স্মৃতিচারণে সবার আগে উঠে এলেন হাবিব। ‘মাঠের বাইরে আমাদের উজ্জীবিত করেছিল লড়তে। যেভাবে বলে বড়ে মিঁয়া, ওভাবেই বলেছিল, মাঠে নামার পর আমরা সবাই ফুটবলার। যতক্ষণ মাঠে থাকব, মনে রাখব সেটাই।’ গৌতম সরকার বলছিলেন, ‘কলজে ছিল, কলজে। ফুটবল মাঠে ওটাই জরুরি, বুকের ওই খাঁচাটা। তাতিয়ে দিয়েছিল আমাদের এমন যে, কী বলব।’ শ্যাম থাপার মতে, ‘গোলটা করেছিলাম আমি, বানিয়ে দিয়েছিল তো হাবিবই। তারপর নিজেও গোল করল, এগিয়ে দিয়েছিল। পেলের দলের বিরুদ্ধে আমরা এগিয়ে আছি ২-১, ভাবা যায়? হাবিব কিন্তু ভেবেছিল, করা যায়। তাই পেরেছিল।’
সত্যিই তো তা হলে ভুলে যাননি সতীর্থরা। কেন তা হলে ডাক পেলেন না হাবিব? অনুষ্ঠানের আয়োজক হাবিবের মোহনবাগান সতীর্থরা নন। দায়িত্ব নিয়েছিলেন আয়োজকরা। হায়দরাবাদের একা হাবিব নন, তাঁর ভাই আকবরও আসেননি ১২ অক্টোবর, নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে। আমন্রণই পাননি। সাতাত্তরের পেলে-ম্যাচে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি।
হাবিব জানতে চাইছিলেন, কী কী হল, কী কী হবে। ‘আমরা ভাগ্যবান। কারণ পেলে খেলেছিল তখন। এবার তো আর খেলবে না, তাই না? কী করে খেলবে, পঁচাত্তর হতে চলল। মাঠে খেলা আর ফাংশানে থাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য’, বলছিলেন।
এমনকি, পেলের বিরুদ্ধে ম্যাচ অবিস্মরণীয় বলেও ওই ম্যাচটাকেই জীবনের সেরা বলতে রাজি নন। ‘কত ম্যাচ খেলেছি। ইন্ডিয়ার হয়ে, ক্লাবের হয়ে। গুরুত্বপূর্ণ, ট্রফি জেতার ম্যাচ। পেলে ছিলেন বিপক্ষে, নিউইয়র্ক কসমস অনেক বড় টিম, ঠিক। কিন্তু, টুর্নামেন্টের ম্যাচ ছিল না তো! ফ্রেন্ডলি। তবে পেলে তখন ফুটবলের রাজা। এখনও, কিন্তু অনেক দিন আগে খেলা ছেড়ে দিয়েছে। তখনও কিন্তু খেলছিল। কাজেই দুটো ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা।’
‘জান লাগা কে’ খেলেছিলেন তবু। যেমন খেলতেন বলে জনশ্রুতি, যে কোনও ম্যাচেই। কসমস সব জায়গায় জিততে জিততেই আসছিল। ইডেনে ছন্দপতন। রেফারি লক্ষ্মী ঘোষ পেনাল্টির ভুল সিদ্ধান্ত না-দিলে জিততেই পারত মোহনবাগান যা সেই সময় বিরাট কৃতিত্ব, নিঃসন্দেহে।
ঠিক যেমন খুবই ভাল হত, সুব্রত ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে যে-ফুটবলাররা রবিবার সন্ধেয় পেলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাসিহাসি মুখ করে গ্রুপ ফটো তুললেন সেই ছবিতে হাবিবও থাকলে।
‘কী হত খবর দিলে? আমিও একবার যেতাম, ছবি তুলতাম। ভালই লাগত। কিন্তু ওই যে বললাম, সবাই তো ভুলেই গেছে। কেনই বা ডাকবে আমাকে’, বড়ে মিঁয়ার কণ্ঠে অভিমান ঝরে পড়ে, লুকনো যায় না টেলিফোনেও।
সত্যিই তো, কলকাতা থেকে হায়দরাবাদ কি সাও পাওলো থেকে কলকাতার দূরত্বের চেয়েও বেশি? যাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ম্যাচে নিজেদের মেলে ধরতে কোনও অসুবিধে হয়নি সতীর্থদের তাঁকে একবার ডাকা গেল না নিজেদের উদ্যোগেও? আয়োজকরা ভুলে গেছেন, যেতেই পারেন। মনে করিয়ে দেওয়াটাও কি উচিত ছিল না সতীর্থদের, বিশেষত অধিনায়কের?

হয়ত করেছিলেন, হয়ত করেননি। হায়দরাবাদে হাবিব কিন্তু বড্ড অভিমানী এখন, ব্যথিতও।
Post a Comment